জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণী : সত্য-মিথ্যার বেসাতি (প্রথম পর্ব)

 নূরুল ইসলাম বরিন্দী :

ইতিহাসের যাত্রারম্ভ থেকে আজ অবধি দীর্ঘকালের পথপরিক্রমায় জ্যোতির্বিজ্ঞান বা জ্যোতিষশাস্ত্র পেরিয়ে এসেছে অনেক চড়াই-উৎরাই। ব্যাপকভাবে চর্চিত এ শাস্ত্র হয়ে উঠেছে মানুষের কাছে কৌতূহলী ও জনপ্রিয়। কিছুসংখ্যক ভবিষ্যৎদ্রষ্টার বাণী বিভিন্ন সময় সন্দেহ-সংশয়ের জন্ম দিয়েছে, আবার এমন কিছু জ্যোতির্বিদকে আমরা জানি যাদের শতকরা আশি থকে একশভাগ ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়েছে।

এই উপমহাদেশেই শুধু নয়, বিশ্বে প্রায় প্রতিটি দেশেই জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চা বিদ্যমান। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ৩শটি দৈনিকের পাতায় প্রতিদিন প্রকাশিত হয় ভবিষ্যদ্বাণীর কলাম। জাপান, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, কম্পুচিয়াসহ প্রাচ্যের বহু দেশেই দিনকে দিন বেড়েই চলেছে জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রচার এবং প্রসার। তাছাড়া এ শাস্ত্রকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গড়ে উঠেছে বড় বড় সংগঠন।

কিন্তু তবুও বিজ্ঞান-স্বীকৃত এ শাস্ত্রকে কেন্দ্র করে সময় সময় নানান প্রশ্নের অবতারণা হতে দেখা যায়। প্রশ্ন শাস্ত্র নিয়ে নয়, যারা এ শাস্ত্রটি চর্চা করেন তাদের নিয়ে। সত্য বটে বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে এ শাস্ত্রের । কিন্তু সেই মানদন্ডেই কী বিচার্য হতে পারেন শাস্ত্রজ্ঞ জ্যোতির্বিদগণ? যেখানে আমরা প্রাচীন জ্যোতির্বিদদের অধিকাংশ ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হতে দেখি, সেখানে হাতেগোনা দু-একজন ছাড়া আধুনিককালের বহু নামকরা জ্যোতির্বিদের ভবিষ্যৎবাণী সঠিক হতে দেখি না। এর কারণ কী? পর্যায়ক্রমে এ প্রসঙ্গের উদাহরণ টানা যাবে। প্রথমে আসা যাক সেইসব ভবিষ্যৎদ্রষ্টার কথায়,-যাদের ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক হয়েছে শতকরা একশ ভাগ।

প্রফেসর কিরো

হস্তরেখা বিশেষজ্ঞ ও জ্যোতিষীদের শিরোমণি হিসেবে সমধিক পরিচিত প্রফেসর কিরো। কালজয়ী অভ্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীর জন্য তিনি বিশ্বে একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। অত বড় নামকরা পুলিশ বিভাগ স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড। তারাও কোনো জটিল রহস্যের গ্রন্থি উন্মোচনে সাহায্য প্রার্থনা করতো প্রফেসর কিরোর। তিনি দিব্যদৃষ্টিরবলে এসব রহস্যের তাৎক্ষণিক সমাধান দিয়ে আরোহণ করেছিলেন জনপ্রিয়তার শীর্ষে।

১৯৪৩ সালে ‘অখন্ড জ্যোতি’ পত্রিকায় ভারত সম্পর্কিত প্রফেসর কিরোর ভবিষ্যদ্বাণী ছিল এ রকমঃ “ইংল্যান্ড ভারতকে স্বাধীনতা তো দেবেই, তবে সম্প্রদায়গত বিবাদের কারণে ভারতে সৃষ্টি হবে বিশৃংখল অবস্থা। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধদের চিরবিভক্তি হয়ে উঠবে অনিবার্য। ”

বৃটিশ সরকারের দমননীতি যে সময়ে তীব্রতর হয়ে ওঠে সে সময়ের ভারত সম্পর্কে কিরোর মন্তব্য ছিলঃ “ ভারতবর্ষের স্বাধীনতার অভ্যুদয় পৃথিবীর কোনো শক্তিই রুখতে পারবে না। ”

জিন ডিকসন

‘ক্রিস্টাল বল’ খ্যাত জিন ডিকসন যুক্তরাষ্ট্রের একজন অত্যন্ত সফল ভবিষ্যৎদ্রষ্টা। বলতে গেলে এই মহিলাই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ জ্যোতিষী। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এর পরিচিতি সুবিদিত। বিশেষ করে রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণীর সফলতা তাকে চিহ্নিত করেছে কিংবদন্তীর জ্যোতিষরূপে। ১৯৪৪ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মৃত্যু সম্পর্কিত পূর্ব ঘোষণা দিয়েছিলেন এভাবেঃ “ মিঃ প্রেসিডেন্ট, আগামী বছর, অর্থাৎ ১৯৪৫ সালেই আপনার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।” ওই সালের মাঝামাঝি সময়ে রুজভেল্টের মৃত্যু হলে সারা বিশ্বে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে জিন ডিকসনের। এরপর আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেণ্টের উদ্দেশে জিন ডিকসনের মন্তব্যঃ “আপনি খুব শিগগিরই প্রেসিডেন্ট হবেন”। এ ভবিষ্যদ্বাণীও সত্যে পরিণত হয়। ভারত বিভাগ সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণী বহু আগেই করেছিলেন জিন ডিকসন। উপমহাদেশ সম্পর্কিত একটি ঘটনা, যা পৃথিবীর সবাইকে চমকে দিয়েছিল তা উল্লেখ করা যাক।

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি। নিজের ফ্লাটে কয়েকজন সহকর্মীর সাথে আলাপ করছিলেন মিসেস জিন ডিকসন। হঠাৎ প্রসঙ্গ পালটে তিনি বলে উঠলেনঃ “এখন, এই মুহূর্তে আমি দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি ভারতে মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের কিছু সময় নিশ্চুপ থাকা উচিত”।

আর কী আশ্চর্য! ঠিক সে সময়েই ভারতে নাথুরাম গডসের রিভলভারের গুলিতে নিহত হন মহাত্মা গান্ধী। ঘন্টা কয়েকের মধ্যে এ খবর পৌঁছে যায় আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে। বৃটেনে উইনস্টাইন চার্চিলের প্রধানমন্ত্রী  হওয়া, রাশিয়ায় স্টালিনের পরে মলোটভের প্রধানমন্ত্রী হওয়া, জন, এফ কেনেডীর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া, নিকিতা ক্রুশ্চেভের পতন, জওহরলাল নেহরুর মৃত্যু, লালবাহাদুর শাস্ত্রীর প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচিত হওয়া সংক্রান্ত জিন ডিকসনের ভবিষ্যদ্বাণী প্রায় অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিল।

“প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ৪ বছরের মধ্যে জন এফ কেনেডী নিহত হবেন”—এ কথা নির্বাচন-পূর্ব সময়েই ব্যক্ত করেছিলেন জিন ডিকসন। তাছাড়া কেনেডী হত্যার ব্যাপারে হত্যাকারীর নামের আদ্যাক্ষর ও শেষাক্ষর বলে দেওয়া ছাড়াও সপ্তাহখানেক আগেই জিন ডিকসন টেলিফোনে “এ সপ্তাহেই মাননীয় প্রেসিডেন্ট নিহত হবেন” বলে কেনেডীর সচিবকে জানিয়েছিলেন।

পিটার হারকোস

অতীন্দ্রিয় শক্তির আরেকজন অদ্ভূত ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব পিটার হারকোস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি বন্দি ছিলেন জার্মানির একটি কারাগারে। জেলখানায় পিটার একদিন তার সঙ্গীদের বললেন, “৫ জুন আমরা অবশ্যই জেল থেকে মুক্তি পেয়ে যাবো।” ১৯৪০ সালের ৪ জুন মিত্রবাহিনী জার্মানি আক্রমণ করে এবং ৫ জুন পিটার ও তার সঙ্গীরা জেল থেকে মুক্তিলাভ করেন।

১৯৫০ সালের একটি ঘটনা। ইংল্যান্ডের রাজপ্রাসাদ থেকে মহামূল্যবান ‘স্ক্রন মণি’ চুরি হয়ে যায়। বৃটিশ সি আই ডি এবং স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড এ চুরির রহস্য উদ্ঘাটনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়। শেষাবধি তারা বিফল হলে সাহায্য নেয়া হয় পিটার হারকোসের। এ রহস্য উদ্ঘাটনে তার সময় লাগে মাত্র মিনিট কয়েক। আসল অপরাধী ধরা পরে গেলে ‘থ’বনে যায় ঐতিহ্যবাহী বৃটিশ পুলিশ ও স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড। পিটার তার সামনে উপস্থিত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূত-ভবিষ্যৎ বাতলে দিতে পারতেন নির্ভুলভাবে। এই অদ্ভূত ক্ষমতা পিটারকে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে ইউরোপ-আমেরিকায়। ভবিষ্যৎদ্রষ্টা হিসেবে পিটারের সফলতা প্রায় একশভাগ।

প্রফেসর হেরার

সমসাময়িককালের আরেকজন সফল ভবিষ্যৎদ্রষ্টা প্রফেসর হেরার। তিথি বিচার-বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎবাণী করার জন্য তিনি সমধিক প্রসিদ্ধ। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সঠিক দিন-তারিখ তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যুদ্ধের বছর দুই আগেই । বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্পর্কিত তার ভবিষ্যৎবাণী তিনি এমন সময় করেছিলেন যা ছিল সবার কাছে অকল্পনীয়।

নোস্ত্রাদামস

বিশ্বখ্যাত ভবিষ্যৎবক্তা নোস্ত্রাদামসের নাম বিখ্যাত হয়ে ওঠে ফরাসি বিপ্লবের ওপর ভবিষ্যদ্বাণী করে। পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে এ পর্যন্ত বহু ভবিষ্যৎবাণীই বহুলাংশে সত্যে পরিণত হয়েছে নোস্ত্রাদামসের। সম্রাট নিপোলিয়ান সম্পর্কে তার ভবিষ্যৎবাণী ছিলঃ “ইটালির সন্নিকটে একটি অখ্যাত পরিবারে জন্মগ্রহণকারী এক বালক হবেন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর সম্রাট। নিজের সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য লিপ্ত হবেন অমানবিক কার্যকলাপে।” বলা বাহুল্য এ কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে নোস্ত্রাদামস এক শতাব্দী আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন–“আগ্নেয়াস্ত্র এবং মহাবিধ্বংসী বোমার আঘাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে সমুদ্র বন্দর সন্নিকটবর্তী দুইটি শহর। এ ভবিষ্যদ্বাণীর প্রকৃষ্ট প্রমাণ আণবিক বোমার আঘাতে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকী। বাকি অংশ অন্যদিন……

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, Email: nibarindi@gmail.com