
শামীমের বিরুদ্ধে তিন ও ফিরোজের বিরুদ্ধে দুই মামলা
০৬:২৭, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

মিঠাপুকুর২৪নিউজ ডেস্ক
শূন্য থেকে শত শত কোটি টাকার মালিক জি কে বিল্ডার্সের চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় তিনটি মামলা দায়ের হয়েছে। অস্ত্র, মানি লন্ডারিং ও মাদক আইনে মামলাগুলো দায়ের করা হয়েছে। অস্ত্র ও মাদক আইনে দায়ের করা দুই মামলায় পাঁচ দিন করে মোট ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। অপরদিকে, শফিকুল আলম ওরফে ফিরোজ আলমের বিরুদ্ধে দায়ের করা অস্ত্র ও মাদক আইনের দুই মামলায় পাঁচ দিন করে মোট ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।
শনিবার দুপুরে জি কে শামীম ও তার সাত দেহরক্ষীকে গুলশান থানায় নিয়ে যান র্যাব সদস্যরা। বিকালে দুই মামলায় ২০ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে তাদেরকে আদালতে পাঠানো হয়।
গুলশান থানার ওসি কামরুজ্জামান বলেন, র্যাব তিনটি অভিযোগ দিয়েছে। এর একটি মাদক আইনে, একটি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে এবং আরেকটি অস্ত্র আইনে। এসব মামলার আসামি হিসেবে জি কে শামীমসহ আট জনকে রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি। অস্ত্র ও মুদ্রা পাচার মামলায় শামীমসহ আট জনকে আসামি করা হয়েছে, মাদকের মামলাটিতে শুধু শামীমই আসামি। গ্রেপ্তার দেহরক্ষীরা হলেন—আমিনুল, কামাল, শহিদুল, মুরাদ, দেলোয়ার, জাহেদ ও সায়েম।
শুক্রবার রাতে উত্তরা র্যাব-১ এর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় জি কে শামীমকে। সেখানে র্যাবের একটি দল তাকে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ করে। ঐ জিজ্ঞাসাবাদে শামীমের উত্থান কীভাবে হলো তার বর্ণনা শামীম নিজেই দিয়েছেন। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি তার কবজায় কীভাবে যেত তা তিনি র্যাব সদস্যদের জানিয়েছেন। সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারি উচ্চ পর্যায়ের ঠিকাদারি পাওয়ার ক্ষেত্রে যুবলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের হাত রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে মোটা অঙ্কের কমিশন দিতেন ঐসব নেতাদের।
এদিকে, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়াকে গ্রেপ্তারের পর র্যাব জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। কিন্তু, দলগত ক্ষমতার দম্ভে ও বড়ো ভাইদের তার ওপর আশীর্বাদ থাকার কারণে তিনি প্রথমে কোনো তথ্যই দিতে চাচ্ছিলেন না। পরে র্যাব সদস্যদের জোর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি একে একে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিতে থাকেন। তার তথ্যে বেরিয়ে আসে একের পর এক রাঘববোয়ালদের নাম।
খালেদ ক্যাসিনোর অপারেটিং সিস্টেম দেখতেন
ক্যাসিনোর ব্যাপারে খালেদের কোনো ধারণা ছিল না। যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের সঙ্গে সখ্য হওয়ার পর তিনি ঢাকাসহ বিভিন্নস্থানে ক্যাসিনো চালাতে থাকেন। রাজধানীতে যে কয়টি আধুনিক ক্যাসিনো ছিল সেগুলোর বেশিরভাগই অপারেটিং সিস্টেম দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। আর তার ক্যাসিনো ব্যবসা চালাতে সহযোগিতা করতেন ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্র্রাট ও যুবলীগ নেতা এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ। ইয়ংমেন্সসহ রাজধানীর বিভিন্ন ক্যাসিনো থেকে খালেদ মাসে ১ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করতেন। ঐ টাকার ভাগ পেতেন যুবলীগের কিছু নেতা ও পুলিশের কিছু কর্মকর্তা। তবে আভিযানের আগেই সাঈদ ও সম্রাটের আরেক ডান হাত ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের (উত্তর) সাবেক সভাপতি এস এম রবিউল ইসলাম সোহেল সিঙ্গাপুরে পালিয়ে গেছেন। ঢাকা বাদেও গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় তার আরো চারটি ক্যাসিনো আছে বলে র্যাব জানতে পেরেছে। তাকে র্যাবের সদস্যরা গ্রেফতারের পরেই ঐ চারটি ক্যাসিনো বন্ধ করে পালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গত জুলাই মাসে চাঁদার টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে কাকরাইলে সম্রাটের ব্যক্তিগত অফিসে একটি বৈঠক হয়। সেখানে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ঘটে। সেখানে মতিঝিল জোনের পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। ঐ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এর আগেও রামপুরা এলাকায় চোরাকারবারির কাছ থেকে সোনা জব্দ করে গায়েব করার অভিযোগ ছিল। পরে ঐ বৈঠকে চাঁদার টাকা ভাগভাটোয়ারার ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ সমঝোতা হয়।
জি কে শামীমের সঙ্গে সবার সখ্যতা
শামীম প্রথমে বাসাবো এলাকায় একটি আবাসন কোম্পানির কর্মচারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। একপর্যায়ে ঐ আবাসন কোম্পানির মালিকের সঙ্গে তার খাতির জমে। যুবলীগের রাজনীতি করার কারণে যুবলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাভাজনে পরিণত হন। এরপর একের পর এক তিনি ঠিকাদারি ব্যবসা পেতে থাকেন।
সূত্র জানায়, সরকারি ও বেসরকারি বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করার ক্ষেত্রে তিনিই টেন্ডার পেতেন। বিশেষ করে রাজউক ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের তিনি বড়ো কুতুবে পরিণত হন। কোনো বড়ো টেন্ডার অন্যজনের কাছে যেত না। শামীমকে টেন্ডার দেওয়ার বড়ো কমিশন পেতেন গণপূর্ত বিভাগের এক কর্মকর্তা। ঐ কর্মকর্তা র্যাবের নজরদারিতে আছেন। তার দেশ ত্যাগ ঠেকাতে সতর্ক রয়েছে ইমিগ্রেশন পুলিশ।
সূত্র জানায়, গণপূর্ত বিভাগে শামীম যেসব কাজ পেতেন তার জন্য সচিবালয়ে বড়ো তদবির করতেন যুবলীগের এক কেন্দ্রীয় নেতা। ঐ তদবিরের কারণে তিনি মোটা অঙ্কের কমিশন পেতেন বলে জানা গেছে।
কলাবাগান ফিরোজ ১০ দিনের রিমান্ডে
কলাবাগান ক্রীড়াচক্র ক্লাবের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজের ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। শনিবার ঢাকা মহানগর হাকিম বেগম মাহমুদ আক্তার শুনানি শেষে অস্ত্র মামলায় পাঁচ দিন ও মাদক আইনে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তার আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করলে আদালত তা নামঞ্জুর করে। এর আগে ধানমন্ডি থানায় অস্ত্র আইনে দায়ের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক নুর উদ্দিন ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। একই থানায় মাদক আইনে দায়ের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক আশিকুর রহমানও ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন।
শুক্রবার রাতেই র্যাব-২ এর পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ খান বাদী হয়ে অস্ত্র ও মাদক আইনে দুইটি মামলা করেন। অস্ত্র আইনে দায়ের হওয়া মামলাটির নম্বর ২০(৯)১৯ ও মাদক আইনে দায়ের হওয়া মামলার নম্বর ২১ (৯)১৯। তবে শুক্রবার দুপুর দেড়টার দিকে শফিকুল আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র্যাবের হেফাজতে নেওয়া হয়। সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে কলাবাগান ক্রীড়াচক্র ক্লাবে অভিযান চালায় র্যাব।
র্যাব সূত্র জানায়, প্রাথামিক জিজ্ঞাসাবাদে শফিকুল আলম স্বীকার করেন যে, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় দেখিয়ে কলাবাগান অফিস কক্ষে নিরাপদ আশ্রয় গড়ে তুলেছিলেন। এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে অবৈধ মাদকদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়সহ বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপও করে আসছিলেন।
সূত্র- দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকা- (২২.০৯.২০১৯)