আপন নিবাসে অন্তিম যাত্রা

 নূরুল ইসলাম বরিন্দী :

রাত আটটা নাগাদ ট্রেন এসে থামলো রংপুর স্টেশনে। চোখে পুরু লেন্সের চশমা। পরনে ধবধবে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবিপরা যে বৃদ্ধ লোকটি প্লাটফরমে পা রাখলেন তিনিই আমাদের এ গল্পের মূল চরিত্র। নাম বাবু প্রবোধচন্দ্র রায়। বর্তমান নিবাস পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুরে। তেঁতুলিয়া সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের শেষ স্টেশন রুহিয়ায় ট্রেনে ওঠার পর থেকে প্রবোধ বাবুর বুকের ভেতরটায় যে তোলপাড়ের তাণ্ডব শুরু হয়েছিল তা ক্রমশই দ্রুততার রূপ নিচ্ছিল ট্রেনযাত্রার পুরো সময়টায়। রংপুর স্টেশনে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে সেই তোলপাড়ের রূপটা যেন একটা উত্তাল ঢেউয়ে পরিণত হতে লাগলো। প্রবোধ বাবু অনুভব করতে লাগলেন তিনি বদলে যাচ্ছেন, তার ভেতরটা বদলে যাচ্ছে, তিনি প্রচন্ডভাবে এক স্মৃতি-আক্রান্ত মানুষে পরিণত হচ্ছেন।

প্লাটফরম ছেড়ে বাইরে আসতে গিয়ে হঠাৎ প্রবোধ বাবুর মনে হতে লাগলো এ তিনি কোথায় এসে পড়লেন? এটা তো এখন তার দেশ নয়। তিনি এখন ভারত নামের অন্য একটি দেশের বাসিন্দা। তার বর্তমান ঠিকানাঃ গ্রাম রাধারামপুর, থানা হরিরামপুর, জেলা দক্ষিণ দিনাজপুর, ভারত। অথচ এই বাংলাদেশই ছিল একদিন তার নিজের দেশ।

তার প্রিয় জন্মভূমি। তার পিতা-প্রপিতামহের আপন নিবাস। রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানাধীন রাণীপুকুরে এখনও রয়েছে তার পৈতৃক ভিটেমাটি। সপরিবারে সেখানেই কেটেছে প্রবোধ বাবুর পঁয়ষট্টিটি বছর। বর্ণাঢ্য একটা জীবনের সিংহভাগ। এপারে বাংলাদেশ। ওপারে ভারত। কোনটা আপন দেশ প্রবোধ বাবুর? জন্মভূমি বাংলাদেশ নাকি বর্তমান নিবাস ভারত?

এ রকম একটা কঠিন এবং অমীমাংসিত প্রশ্ন চোখে-মুখে ফুটে উঠতেই যন্ত্রণায় প্রায় কুঁকড়ে যেতে থাকেন প্রবোধ বাবু। বয়সের ভারে ঝুলে পড়া দেহটা আরও ন্যূব্জ হয়ে পড়ে। তিনি উদাস দৃষ্টি মেলে ধরেন উন্মুক্ত বিশাল আকাশের দিকে। ওই আকাশের কোনো সীমানাচিহ্ন নেই মাটির জমিনের মতো। তার বিশাল অবয়বে দিগন্তব্যাপী ঝলমল করছে অসংখ্য নক্ষত্ররাজি।

স্টেশন পেছনে ফেলে বড় রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ালেন প্রবোধ বাবু। এখনো চারদিকে আধো আলো আধো অন্ধকার । রাতের তারা ঝলমল আকাশের দিক থেকে মুখ আনত করলেন নিচের দিকে। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বুকের গহ্বর থেকে। হাহাকারময় শূন্যতায় ক্রমশ মিশে যেতে থাকলো সে নিঃশ্বাসের শব্দ। প্রবোধ বাবু অনুভব করলেন তিনি ক্রমান্বয়ে আত্মগত হচ্ছেন, বিস্মৃতির পাতায় হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো জীবন্ত হয়ে উঠছে, যেন স্বচ্ছ আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছে সেলুলয়েডের রিবন।——বাল্য এবং কৈশোরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রতিবেশী আবুল হোসেনের সঙ্গে কয়েক বছর ধরে দেখা-সাক্ষাৎ না হলেও যোগাযোগটা ছিল নিরন্তর। তার লেখা চিঠিটা পেয়েছেন গতমাসের শেষের দিকে। তাতে আবুল হোসেন লিখেছিল, বার্ধক্যেরভারে সে নাকি শয্যাশায়ী। কখন প্রাণপাখি খাঁচা ছেড়ে শূন্যে উড়াল দেয় তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অতএব প্রবোধচন্দ্র যেন একটিবারের জন্য হলেও এসে তাকে আমানতদারীর দায় থেকে মুক্তি দেয়। তা নাহলে আমানত খেয়ানত করার অপরাধে রোজ কেয়ামতে তাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

আবুল হোসেনের চিঠিটা পাওয়ার পর থেকেই ভয়ানক এক অস্থির সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে একটা স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হয়েছে প্রবোধ বাবুকে। অতঃপর কাউকে কিছু না বলে একবস্ত্রে সীমান্ত পার হয়ে ট্রেনে চেপেছেন তিনি। গ্রাম্যপথে আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি। ভিসা-পাসপোর্টেরও কোনো প্রয়োজন পড়েনি।

রংপুর শহর থেকে সোজা দক্ষিণমুখি বড় রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে ১২/১৩ কিলোমিটার পরেই রাণীপুকুরের অবস্থান। শহরে যাতায়াতের সোজা সহজ রাস্তাটা কী পাকা হয়নি এত বছর পরেও? হয়ে থাকলে অবশ্যই যানবাহন চলাচল করছে। একজন রিকশাঅলাকে জিজ্ঞেস করতেই  সে রাস্তাটা পাকা হওয়ার খবর জানালো। আর সে-ই রাজী হলো চল্লিশ টাকার ভাড়ায় সেখানে যেতে। সময় লাগতে পারে দেড়-দুঘন্টা।

রিকশা লালবাগহাট ডানে রেখে কারমাইকেল কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতর ঢুকে গেল। এ সময় নিজের অজান্তে হঠাৎ বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো প্রবোধ বাবুর। আজ থেকে প্রায় চার যুগ আগের স্মৃতি ভেসে উঠলো মনের আর্শিতে। যৌবনের সোনালি সময়ের তিন তিনটে বছর কেটেছে এই কলেজে। সেই জিএল রায় ছাত্রাবাস, সেই লালটালির ছাত্র-কমোনরুম, সেই ঝাঁকড়া বট গাছটা দাঁড়িয়ে রয়েছে কালের সাক্ষী হয়ে। তবে পুরনো ছোট ছোট কোয়ার্টারগুলোর পাশাপাশি গজিয়ে উঠেছে নতুন নতুন দালান-কোঠা। এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠে প্রবোধ বাবু নিজে পড়েছেন, দুই ছেলে, দুই মেয়ে এখান থেকেই ডিগ্রি পাস করেছে। কত স্মৃতি, কত কথা! ওই তো পশ্চিমপ্রান্তের শেষ মাথায় দেখা যাচ্ছে অধ্যাপক বিল্লমঙ্গলের লালটালির বাসাটা। হ্যাঁ, ওই বাসাতে থেকেই তার বড় মেয়ে অনিতা আর ছোট মেয়ে নমিতা কলেজে পড়াশোনা করতো।

’৭১-এর এক কালরাতে খান সেনারা এসে চড়াও হলো বিল্লমঙ্গলের কোয়ার্টারে। পেছন দরজা দিয়ে বাসার অন্য মেয়েরা পালাতে পারলেও অনিতা পারেনি। বর্বর খান সেনারা সারা রাত ধরে পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছিল মেয়েটার ওপর। ভোর রাতে চলে যাবার সময় তারা ধরে নিয়ে গেল বাংলার অধ্যাপক বিল্লমঙ্গলকে। তিনি আর ফিরতে পারেননি জীবিত। লাশ হয়ে চলে গেছেন শ্মশানে। আত্মীয়-স্বজনদের আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ওপারে, দক্ষিণ দিনাজপুরে। প্রবোধ বাবু পরে খোঁজ পেয়েছিলেন বিল্লমঙ্গলের পরিবারের সঙ্গে চলে গেছে নিরাপদে ওপার বাংলায় ছোট মেয়ে নমিতা। অনিতা তার কাছে থাকলেও বেঁচে ছিল মাত্র দিনকয়েক। এক রাতে গলায় ফাঁসির রজ্জু ঝুলিয়ে সতীত্ব হারানোর যন্ত্রণাকে চিরদিনের জন্য মুক্তি দিয়েছে সে। একটা সুন্দর সাজানো গোছানো সংসার যুদ্ধের ডামাডোলে কীভাবে তছনছ হয়ে গেছে প্রবোধ বাবুর—-ভাবতে ভাবতে দুচোখের পাতা ঝাপসা হয়ে আসে তার!

কারমাইকেল কলেজ এখন অনেকদূর পেছনে। আলোকিত শহরের দালানকোঠা আর দৃষ্টিগোচর হয় না। রিকশা এখন অন্ধকার কেটে কেটে সামনের দিকে এগোচ্ছে। রাস্তার দুপাশে বাঁশঝাড়, ধানক্ষেত, গাছ-গাছালি, গ্রাম-গ্রামান্তর। চারপাশে থোকা থোকা জোনাকজ্বলা দৃশ্য। মাথার ওপর নক্ষত্রখচিত বিশাল আকাশ। নিঝুম, নিস্তব্ধ চারদিক। রিকশায় বসা প্রবোধ বাবু নিরব-নিশ্চুপ। এ রকম একটা শান্ত-সমাহিত পরিবেশের মধ্যে প্রকৃতির নৈঃশব্দতার আবহে প্রবোধ বাবু ক্রমশ নিজের মধ্যে কুঁকড়ে যেতে থাকলেন,তার সমস্ত অনুভূতি জুড়ে শুধু স্মৃতিময়তার আবছা কুয়াশা বিস্তৃত হতে থাকলো চারপাশ। একটা চাপা কান্নার দলা আকুলি-বিকুলি করতে থাকে গলার ভেতর।

অন্ধকারে তার যন্ত্রণাকাতর মুখাবয়ব দেখা না গেলেও রিকশাঅলার কানে ভেসে এলো বৃদ্ধযাত্রীটির গলার চাপা কান্নার আওয়াজ। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না সে। পা দিয়ে জোরে জোরে প্যাডেল চালাতে থাকলো। শেষ জানুয়ারির শীত তেমন তীব্র না হলেও উন্মুক্ত মাঠের ওপর দিয়ে বয়ে আসা খোলা হাওয়া গায়ে কম্বল জড়াতে বাধ্য করলো প্রবোধ বাবুকে। চোখ বুঁজে মনে মনে হিসেব করতে থাকলেন তিনি। এটা ১৯৯৫ সালের জানুয়ারি মাস। তিনি দেশ ছেড়েছেন ’৭১-এর আগস্ট মাসে । অংকের হিসেবে পঁচিশ বছর।

পিতৃপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে ভিনদেশে গিয়ে বসবাস করতে হবে এমন চিন্তা কী কোনোদিন করেছিলেন প্রবোধ বাবু? ’৪৭ সালের দেশবিভাগ, ’৬৫সালের পাক-ভারত যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়ংকর ঘটনাবলী– সবকিছু প্রত্যক্ষ করেও প্রভাবিত হননি প্রবোধ বাবু। তার প্রতিজ্ঞাকে টলাতে পারেনি কোনোকিছু। আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে অনেকেই জায়গা-জমি বিক্রি/বিনিময় করে চলে গেছে ওপারে। তিনি তাদের বিদ্রূপ করেছেন। নিষেধ করেছেন, এমনকি কারো কারো সঙ্গে সম্পর্ক পর্যন্ত ছিন্ন করেছেন প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে ভিনদেশে চলে যাওয়ার কারণে। অথচ সেই প্রচন্ড স্বদেশাভিমানি প্রবোধ বাবু নিজেও বাধ্য হয়েছিলেন মাতৃভূমির মায়া ছেড়ে ওপার বাংলায় চলে যেতে। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ যেমন তছনছ করে দিয়ে গেছে সবকিছু, লুকিয়ে লুকিয়ে চোরের মতো নিজ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার গ্লানিকে গ্লানি মনে হয়নি সেদিন। সবার চেয়ে জীবন প্রিয় , জীবনের চেয়ে সম্ভ্রম বড় ! সেই জীবন আর সম্ভ্রম রক্ষার জন্যই শেষ পর্যন্ত ভারতে শরণার্থী হওয়া প্রবোধ বাবুর আর ফিরে আসা সম্ভব হয়নি। মনে মনে শুধু একটা অদৃশ্য সুতোর বন্ধন অনুভব করেছেন প্রতিনিয়ত। দীর্ঘ নয়  মাস যুদ্ধের পর ’৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হয়েছে। আত্মপ্রকাশ করেছে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে।

হাজার হাজার উদ্বাস্তু ফিরে গেছে নিজ নিজ ভিটেমাটিতে। কিন্তু ফিরতে পারেননি প্রবোধ বাবু। ছেলে-মেয়েদের কেউই রাজী হয়নি পিতৃপুরুষের ভিটেমাটিতে আবার ফিরে যেতে। বড় ছেলে প্রদীপ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষি বিভাগে চাকরিতে ঢুকেছে। ছোট ছেলে সন্দীপ শিলিগুড়ির একটা চা বাগানে ভালো মাইনের চাকুরে। বিয়েথা করে দুজনই নিজেদের সুখী সংসারে কর্মব্যস্ত দিন কাটাচ্ছে। তিনি নিজে উদ্বাস্তু হয়ে যেখানটায় মাথা গুঁজেছিলেন সেই দক্ষিণ দিনাজপুরের হরিরামপুর থানার রাধারামপুরে স্থায়ী আসন পেতেছেন। জন্মভূমি বাংলাদেশে ফিরে আসার ইচ্ছে মাঝে মাঝে প্রবলভাবে মনে নাড়া দিলেও শেষাবধি তা দমন করতে হয়েছে ছেলে-মেয়েদের গররাজীর কারণে। অবশ্য সন্তানদের গলগ্রহ হয়ে থাকতে হয় না তাকে। ছোট মেয়ে নমিতার বিয়ে দিয়েছিলেন মোটামুটি সচ্ছল পরিবারে। কিন্তু সাত বছরের মাথায় বিধবার বেশে দুটো সন্তানসহ মেয়েটা ফিরে এসেছে পিতৃগৃহে। তিনি হোমিও প্রাকটিস করেন এখনো—যেমনটি করেছিলেন জন্মস্থান রংপুরের রাণীপুকুরে। বিধবা নমিতা একটা প্রাইমারি স্কুলে চাকরি জুটিয়ে নিয়েছে। নামেই পাকা রাস্তা। কোথাও পিচ, কোথাও ইটের সুড়কি বিছানো পথ। প্রায় পুরোটাই এবড়ো খেবড়ো। রিকশার ঝাঁকুনিজনিত দৈহিক কাতরতা আর স্মৃতির কাঁটায় যন্ত্রণাবিদ্ধ হতে হতে প্রবোধ বাবু ভাবালুতা মুক্ত হতে চেষ্টা করতে লাগলেন। ততক্ষণে প্রায় দেড় ঘন্টার পথ অতিক্রম করে এসেছে রিকশা। রাস্তার দুপাশের বাড়িঘর থেকে মৃদু আলোর শিখা আর ভীমের গড়ের বুড়ো বটগাছটাকে অন্ধকারে নিথর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রবোধ বাবু টের পেলেন এটা জানকি ধাপেরহাট এলাকা। আর মাত্র মাইলটাক পথ এগুলেই রাণীপুকুর বন্দর।

গভীর রাতে বাইরে রিকশার ঘন্টাধ্বনি শুনে দরজা খুলে যে লোকটি উৎসুক দৃষ্টি মেলে তাকালো পুরু চশমার ফাঁকে, তাকে একনজর দেখেই চিনে ফেললেন প্রবোধ বাবু—আবেদ হোসেন, আবুল হোসেনের বড় ছেলে। অবিকল বাপের আদলে গড়া চেহারা। কৈশোরের অবিকৃত অবয়ব। আবেদ অবশ্য প্রথমে চিন্তে পারেনি । সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো মধ্যরাতে আগত আগন্তুকের দিকে। প্রবোধ বাবু অস্থির, কম্পিত অথচ গদ গদ কন্ঠে বলে উঠলেন, চিনতে পারছো না বাবা আবেদ! আমি তোমার ডাক্তার কাকু—প্রবোধচন্দ্র রায়।

এবারে চিনতে পারলো আবেদ হোসেন। দুহাতে জড়িয়ে ধরে রিকশা থেকে নামতে সাহায্য করলো প্রবোধ বাবুকে। গলার আওয়াজ সপ্তমে চড়িয়ে কাকাবাবুর আগমনের খবরটা জানান দিতে লাগলো বাড়িময়। ভগ্নস্বাস্থ্য আবুল হোসেন বিছানা ছেড়ে প্রায় দৌড়ে এসে আবেগে বুকে জড়িয়ে ধরলেন তার বাল্যবন্ধুকে। দুজনের সেকি হুহু কান্না! চোখের জল যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠলো দুজনের। দীর্ঘ পঁচিশ বছরের জমাটবাঁধা অশ্রুর বিগলিত ধারা বয়ে চললো অনেকক্ষণ। মিনিট কয়েক পর প্রকৃতিস্থ হয়ে চারদিকে তাকাতে লাগলেন প্রবোধ বাবু। বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করছে চারপাশ। প্রবোধ বাবুকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে চেনা-অচেনা মুখের মানুষজন। সবাই আগন্তুকের আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে পলকহীন দৃষ্টি মেলে।    

আবুল হোসেনের বাড়ির লাগোয়া প্রায় দশ কাঠা জমিজুড়ে প্রবোধ বাবুর পরিত্যক্ত বাড়ি। দুদিকে দুটি টিনের চালাঘর। একদিকে বাঁশঝাড়, বাকি জমিটা নানান রকম গাছ-গাছালিতে পূর্ণ। আম জাম নারিকেল আর নিম গাছের আড়ালে ঢাকা পড়ে আছে ভাঙ্গাচুরা ঘর দুখানা। চারদিকে অযত্নে বেড়ে ওঠা আরো নানান জাতের গাছ- গাছড়া। অনেককাল মনুষ্য বসবাসহীন বাড়ির আনাচে-কানাচে আরশোলা, ইঁদুর, বাদুড়ের অভয়ারণ্য যেন। যাকে বলে পোড়োবাড়ি। আবুল হোসেন মাঝেমধ্যে সাফ- সুতরো যে করেননি এমন নয়। বছর কয়েক একটা কাজের লোক রেখেছিলেন পাহারাদার হিসেবে। সে বেটা আরেক ধড়িবাজ। টাকার বিনিময়ে চোর-ডাকাতদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতো। রাতে গোপনে বসাতো জুয়ার আড্ডা। এসব দেখেশুনে শেষ পর্যন্ত লোকটাকে উঠিয়ে দিয়েছেন আবুল হোসেন। সেই থেকেই পোড়োবাড়ির দশা!

ভোরবেলা প্রবোধ বাবুর ঘুম ভাঙ্গলে তিনি গুটি গুটি পা ফেলে এগিয়ে গেলেন পঁচিশ বছর আগে ফেলে যাওয়া তার পিতৃপুরুষের বাস্তুভিটার বাড়িতে। নব্বই বছর বয়সের বাঁকা শিরদাঁড়া সোজা করে চোখের ঝাপসা জ্যোতি আর অন্তরের দ্যুতিকে একাকার করে তিনি ছুটে বেড়াতে লাগলেন বাড়ির এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত, এ-ঘর থেকে ও-ঘরে। তখন ভোরের পাখির কলকাকলি শুরু হয়ে গেছে। ফিকে হয়ে আসছে পুবের আকাশ। একটু পরই জেগে উঠবে জনমানুষ। প্রবোধ বাবু আনন্দ-আবেগে ছুটাছুটি করতে থাকেন বাড়িময়। একবার জড়িয়ে ধরেন আম জাম গাছের গোড়াকে। একবার উঠানে ছুটে গিয়ে হাত বুলাতে থাকেন শিশিরসিক্ত সবুজ লতাপাতার গায়ে। নরম মাটির বুকে গজিয়ে ওঠা সবকিছুই যেন অমূল্য মণি-মানিক্য। একবার ছুঁতে পারলেই পরম তৃপ্তি। সব পেয়েছির আনন্দ! কী এক পরম সুখকর মমতা মাখানো কৌতূহলের অনিঃশেষ রেশ। দুচোখের পাতায় জল টলমল করে ওঠে প্রবোধ বাবুর। সুখদ আবেশে যেন তার চোখে-মুখে খেলা করে এক অলৌকিক আলোর দ্যুতি। তিনি টের পান না আবুল হোসেন অদূরে দাঁড়িয়ে সবকিছু লক্ষ্য করছে গভীর দৃষ্টিতে। কাছে এসে ধীরে ধীরে বন্ধু প্রবোধ বাবুর কাঁধে হাত রাখেন আবুল হোসেন। আবেগমথিত স্বরে বলেন, গত পঁচিশ বছরে গাছ-গাছালির ফলফলাদি থেকে আয় হয়েছে পঁচিশ হাজার টাকা। তার সবই গচ্ছিত রয়েছে আমার কাছে। জমিটা বিক্রি করতে চাইলে সে ব্যবস্থাও করে দিতে পারি।

প্রবোধ বাবু তার যন্ত্রণাকাতর মুখ তুলে বোবা দৃষ্টি মেলে ধরেন আবুল হোসেনের দিকে। কোনো কথা ফোটে না মুখ দিয়ে। হঠাৎ তারা আবেগে একে অপরকে  জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন নিঃশব্দে। দুই বয়োবৃদ্ধ মানব সন্তানের বর্ণ-গোত্র-দেশ-কাল সবকিছুর গন্ডি যেন মিলে মিশে যায় একই সমতলে—!

রাণীপুকুরে মাসখানেক কেটে গেল প্রবোধ বাবুর। আসার পরপরই বলেছিলেন দিনকয়েক থেকে ফিরে যাবেন বর্তমান নিবাস পশ্চিমবঙ্গের দিনাজপুরে। কিন্তু সে রকম কোনো আভাষ-ইঙ্গিত পাওয়া গেল না একমাস গত হওয়ার পরও। ইতিমধ্যে প্রবোধ বাবুর বাড়ির ঘরদোর ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করা হয়েছে। আগাছার জঙ্গল উপড়ে ফেলে পরিপাটি করা হয়েছে উঠান, আঙ্গিনা। চারদিকে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা হয়েছে বাউন্ডারি। খুঁটি গেড়ে টানা হয়েছে বিদ্যুতের তার। সন্ধ্যা লাগলেই আলো-ঝলমল হয়ে ওঠে সারা বাড়ি। আর সেই আলোয় উচ্ছল-উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বৃদ্ধ প্রবোধচন্দ্র রায়ের চোখ-মুখ!

খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা আবুল হোসেনের পুরনো অভ্যাস। প্রবোধ বাবু আসার পর থেকে প্রত্যহ দুজনে মিলে প্রাতঃভ্রমণে বের হন। রাতের অন্ধকার থাকতেই প্রবোধ বাবু এসে ডাক দেন আবুল হোসেনকে। অন্যদিনের মতো সেদিনও আবুল হোসেন অপেক্ষা করছিলেন কখন এসে ডাক দেন প্রবোধ বাবু। আজ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও আসতে  না দেখে তিনি এগিয়ে গেলেন প্রবোধ বাবুর বাড়ির দিকে। বাঁশের বেড়ার দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢোকেন। ভেজানো দরজায় ধাক্কা দিতেই হা হয়ে গেল দরজা।

একটা সন্দেহ আর শংকায় বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো আবুল হোসেনের। উঁকি দিয়ে দেখলেন প্রবোধচন্দ্র রায় শুয়ে আছেন চিৎ হয়ে। কিন্তু কোনো সাড়া-শব্দ নেই। যেন পরম নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছেন তিনি। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে আবুল হোসেন তার কম্পিত একখানা হাত আলতো করে রাখলেন প্রবোধ বাবুর কপালে। আস্তে করে ডাক দিলেন –প্রবোধ, প্রবোধ—! কোনো সাড়া-শব্দ নেই! নিস্পন্দ-নিথর দেহে হিমশীতল ঠান্ডার স্পর্শ! প্রথমে নিঃশব্দে, পরে আবুল হোসেনের সশব্দ কান্নার আওয়াজটা প্রত্যুষের নিস্তব্ধ চরাচরকে জানিয়ে দিল বন্ধু প্রবোধচন্দ্র রায় আর জীবিত নেই!

নূরুল ইসলাম বরিন্দী, email:nibarindi@gmail.com